AI ফটো ট্রেন্ড: মজার আড়ালে ভয়ঙ্কর এক ফাঁদ
AI ফটো ট্রেন্ড: মজার আড়ালে ভয়ঙ্কর এক ফাঁদ

সাম্প্রতিক ক’দিন ধরে আমি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছি। সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনে হঠাৎ করেই ভেসে উঠছে নানা রঙের ছবি, পরিচিত মুখ, কিন্তু অচেনা রূপে। কেউ যেন হঠাৎ রাজকুমারী হয়ে গেছে, কেউ আবার ফ্যাশন শোয়ের মডেল, কারও গায়ে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কারও বা ভবিষ্যতের সুপারহিরো স্যুট। আর সবই সম্ভব হচ্ছে AI দিয়ে। একটা সাধারণ ছবি আপলোড করলেই কয়েক সেকেন্ডে চমৎকার সব রূপে সাজিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তি। প্রথম দেখায় সত্যি বলতে আমারও দারুণ লেগেছে। অবাক হয়ে ভেবেছি—ওয়াও! প্রযুক্তি কতটা এগিয়েছে!
কিন্তু উচ্ছ্বাসের মাঝেই হঠাৎ যেন বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি জন্ম নিল। প্রশ্ন করলাম নিজেকেই—এই ছবিগুলো যদি অন্যভাবে ব্যবহার হয়? একই প্রযুক্তি যদি আমার ছবি নিয়ে আমাকে নগ্ন করে দেয়, অশ্লীলভাবে সাজিয়ে দেয়, আমি জানতেও পারব না। অথচ চারপাশের সবাই দেখবে ছবিটা, আর বলবে, “এটা তো তোমার মুখই।” তখন আমি কীভাবে প্রমাণ করব ছবিটা ভুয়া?
ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।
আমরা আজকাল ভাইরাল হওয়ার নেশায় আচ্ছন্ন। কেউ বন্ধুদের মুগ্ধ করতে চায়, কেউ ফলোয়ার বাড়াতে। একটা নতুন ট্রেন্ড এলেই ঝাঁপিয়ে পড়ি। কিন্তু জনপ্রিয়তার নেশায় আমরা ভুলে যাচ্ছি নিজের সম্মান, নিজের নিরাপত্তা, নিজের গোপনীয়তার দাম কতটা বড়। আমরা নিজের হাতে নিজের মুখের তথ্য তুলে দিচ্ছি এক অচেনা সিস্টেমের কাছে, আর সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে বিপদের গল্প।
আমি জানি, অনেকেই বলবে, “আরে, এটা তো শুধু মজা।” হ্যাঁ, মজাই বটে। কিন্তু সেই মজা যদি কাল তোমার জীবনকে ভয়ঙ্কর বিপদে ফেলে দেয়? ভাবো তো, তোমার মুখ ব্যবহার করে যদি কেউ এমন ছবি ছড়িয়ে দেয়, যেটা তুমি জীবনে কল্পনাও করোনি? তোমার পরিবার, বন্ধু, সহকর্মীরা সেটা দেখলে কী হবে? তখন তো তারা বলবে, “ছবিটা তোমারই!” আর তুমি হয়তো কেঁদে কেঁদে বলবে, “আমি এটা করিনি।” কিন্তু কে শুনবে তোমার কথা?
এই চিন্তাগুলো আমায় ভয় পাইয়ে দেয়। মনে হয়, আমরা সবাই ধীরে ধীরে এমন এক অজানা ফাঁদের দিকে হেঁটে যাচ্ছি, যেখান থেকে বেরোনো খুব কঠিন হবে।
আমরা কি একটু সচেতন হতে পারি না? প্রতিটি নতুন ট্রেন্ডে ঝাঁপ দেওয়ার আগে অন্তত একবার ভাবি; এই ছবিটা আমি কোথায় দিচ্ছি, কার হাতে তুলে দিচ্ছি, এর ফল কী হতে পারে। আমাদের গোপনীয়তা, আমাদের সম্মান, এগুলো কয়েক সেকেন্ডের মজা বা সামান্য জনপ্রিয়তার চেয়ে অনেক বেশি দামি। নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রযুক্তির হাতে তুলে দেবেন না। আর যদি দিতেই হয়, তবে অন্তত বুঝে শুনে, ভেবেচিন্তে দিন।
আমি এই লেখাটা লিখছি কাউকে ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং সতর্ক করার জন্য। কারণ আমি বিশ্বাস করি, সচেতনতা ছড়ালে হয়তো আমরা বড় বিপদ এড়াতে পারব। এআই আমাদের জীবন সহজ করতে এসেছে, সুন্দর করতে এসেছে, কিন্তু যদি সেটা আমাদের সম্মান কেড়ে নিতে শুরু করে, তাহলে সেই সৌন্দর্যই কালো হয়ে যাবে।
আমি তোমাকে শুধু এতটুকুই বলতে চাই, ভালোবাসো প্রযুক্তিকে, ব্যবহার করো প্রযুক্তিকে, কিন্তু নিজের গোপনীয়তাকে প্রযুক্তির হাতে তুলে দিও না। জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জীবন তোমার শেষ দিন অবধি। নিজের ও প্রিয়জনের কথা ভেবে সচেতনতা বাড়াও।
লেখা – সুমন নিশীথ পতি

